সাদা-কলার অপরাধ: রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

আপলোড সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০২:২৭:০৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০২:২৭:০৫ অপরাহ্ন
আজকের সমাজে অপরাধের চেহারা বদলে গেছে। রাস্তায় ছিনতাই বা খুনের মতো দৃশ্যমান অপরাধের পাশাপাশি এক ধরনের অপরাধ নীরবে সমাজের মেরুদণ্ডকে খেয়ে ফেলছে। এটাই সাদা-কলার অপরাধ। স্যুট-টাই পরা, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যখন তাদের পেশা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে লাখো-কোটি টাকা লুট করেন, তখন সাধারণ মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই অপরাধ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।


সাদা-কলার অপরাধের ধারণা

১৯৩৯ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড সর্বপ্রথম ‘White-Collar Crime’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, যারা সমাজে উঁচু সামাজিক অবস্থানে আছেন এবং পেশাগত জীবনে আইন লঙ্ঘন করেন, তাদের অপরাধই সাদা-কলার অপরাধ। এগুলো সাধারণত অ-হিংসাত্মক—ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ পাচার ইত্যাদি। কিন্তু এর ক্ষতি অনেক বেশি গভীর। একজন সাধারণ চোর হয়তো কয়েক হাজার টাকা নেয়, কিন্তু একজন সাদা-কলার অপরাধী হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারেন।
তবে এখানে একটা বড় সমস্যা রয়েছে। অনেকে বলেন, এগুলো আসলেই ‘অপরাধ’ কি না? কারণ এতে রক্তপাত হয় না, আদালতে প্রমাণ করাও কঠিন। ফলে দায়ী ব্যক্তিরা প্রায়ই শাস্তির আওতায় আসেন না। বাংলাদেশের আইনেও এ ধরনের অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর বিধানের অভাব রয়েছে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে সাদা-কলার অপরাধ এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, দেশটি দুর্নীতির দিক থেকে বিশ্বে খুব নিচের দিকে অবস্থান করছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

২০১২ সালের ১৫ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছিল চাঞ্চল্যকর তথ্য। নবম জাতীয় সংসদের এমপিদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই ‘নেগেটিভ অ্যাকটিভিটিজ’-এ জড়িত ছিলেন এবং ৫৩ শতাংশ সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, রাজনীতির সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক কতটা গভীর।

শেয়ারবাজার কারচুপি, ঋণখেলাপি ও নির্বাচনের অপরাধায়ন

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বারবার কারচুপির শিকার হয়েছে। ১৯৯৬ ও ২০১১ সালের ধসে লাখ লাখ ছোট বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়েছেন। অথচ দায়ী অনেকেই এখনও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। একইভাবে, ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপির পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অনেক ঋণখেলাপি রাজনৈতিক সংযোগের কারণে শুধু শাস্তি এড়িয়ে যান না, বরং নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জয়ীও হন।
এভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে অপরাধায়িত হয়ে পড়ছে। অর্থের প্রভাব, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ যেন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মূল স্পিরিটকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

পেশাজীবীদের দুর্নীতি

শুধু রাজনীতিবিদ নয়, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও এই সাদা-কলার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে সমাজের মূল স্তম্ভগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। একজন ডাক্তার যদি ভুল চিকিৎসা করে বা জাল সার্টিফিকেট দেন, অথবা একজন আইনজীবী যদি মক্কেলের সঙ্গে প্রতারণা করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় যাবে?

গণতন্ত্র কী?

আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রকে সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন—“Government of the people, by the people, for the people”। অর্থাৎ, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার। কিন্তু যখন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ লুট করেন এবং রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করেন, তখন এই গণতন্ত্র কেবল নামসর্বস্ব হয়ে পড়ে। জনগণের সেবার পরিবর্তে হয় ক্ষমতা ও অর্থের লোভ।

সামনে কী করণীয়?

সাদা-কলার অপরাধ মোকাবিলা করা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাদা-কলার অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শেয়ারবাজার, ব্যাংকিং খাত ও সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা আনতে হবে।

সবশেষে, জনগণ ও সুশীল সমাজকে সক্রিয় হতে হবে। শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে বসে থাকলে চলবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণমাধ্যম—সবাইকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সাদা-কলার অপরাধ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে লিঙ্কনের স্বপ্নের গণতন্ত্র আমাদের দেশে কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না। সময় এসেছে এই অন্ধকার চক্র ভাঙার। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে।

লেখক: তোফায়েল আহমেদ সুকান্ত পাটোয়ারী
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)
 

সম্পাদকীয় : দৈনিক সকল সংবাদ


দৈনিক সকল সংবাদ সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও জনজীবনের নানা বিষয় আমরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সচেতন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখাই আমাদের লক্ষ্য।

 

সুইট # ২, (১১ তলা) পল্টন চায়না টাউন (পশ্চিম টাওয়ার), ৬৭/১, নয়াপল্টন ভি আই পি রোড, ঢাকা -১০০০, বাংলাদেশে।
ইমেইল : [email protected]