পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত নাকি চ্যালেঞ্জ

আপলোড সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ১১:৫৭:২৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ১১:৫৭:২৪ পূর্বাহ্ন
ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে সৃষ্ট পানিসংকট ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া রোধে  আগামী ৭ বছরে বাস্তবায়ন করা হবে “পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প”।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ৭ বছরে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হবে।”

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার মানুষ এই প্রকল্পকে সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন হলো, পদ্মা ব্যারাজ কি সত্যিই এই অঞ্চলের পানিসংকটের স্থায়ী সমাধান হবে, নাকি এটি নতুন কিছু পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করবে?

পদ্মা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী, যা হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন  গঙ্গা নদী ভারতে ‘গঙ্গা’ নামে প্রবাহিত হয় এবং বাংলাদেশে ‘পদ্মা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত অনেক নদী শুকিয়ে যায়। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌচলাচল, পানির প্রাপ্যতা এবং বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা দীর্ঘদিনের। সেই ১৯৬০-২০০০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি প্রণয়নের জন্য মোট চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন East Pakistan Water and Power Development Authority (EPWPDA), বর্তমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB)- এর মাধ্যমে প্রথম সমীক্ষা শুরু হয়। ২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (WARPO) কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। এমনকি ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়।

এরপর ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের একটি দল সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় মূল অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়।

প্রায় দুই দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দু'টি ফিশ পাস বা নিরাপদে মাছ চলাচলের জায়গা রাখা হবে। প্রকল্পটি বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭%, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে।

২৮.৮০ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে ২৩.৯০ লাখ টন ধানের ও ২.৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। 

শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। ৬২৩টি ছোট-বড় নদ-নদী পানির সহজপ্রাপ্যতা পাবে।

২০৩৩ সালের পর দ্বিতীয় ধাপে ব্যারাজকে কেন্দ্র করে তিনটি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। আনুমানিক ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। 

কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৯,২৭,০০০ মানুষের।

এত সুফলের পরেও কিন্তু কিছু নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ফলে উজানে ব্যাপক পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যেতে পারে, যা বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়াবে। 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সরবরাহের জন্য পদ্মার পানি সরিয়ে নেওয়া হলে দেশের মধ্যাঞ্চল ও মেঘনা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যেতে পারে এবং লবণাক্ততা আরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। 

এছাড়া এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এতে ভারত ভবিষ্যতে যুক্তি দিতে পারে যে পদ্মা ব্যারাজের বাস্তবায়নের  মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। 

প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়বহুল এই প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত ও নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়নি বলেও সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন। 

প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল গবেষণা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

যদি বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় এবং একই সঙ্গে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি "গেম-চেঞ্জার" প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় এটি ব্যয়বহুল কিন্তু সীমিত সুফল বয়ে আনা আরেকটি মেগা প্রকল্প হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এই সময়ে পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আবেগ নয়, বরং তথ্যভিত্তিক জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন। তবে সর্বোপরি, প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এটি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত হবে নাকি নতুন চ্যালেঞ্জের উৎস হবে। 

উম্মে ফাতিমা মিম,
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৪২, সাভার, ঢাকা
 

সম্পাদকীয় : দৈনিক সকল সংবাদ


দৈনিক সকল সংবাদ সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও জনজীবনের নানা বিষয় আমরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সচেতন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখাই আমাদের লক্ষ্য।

 

সুইট # ২, (১১ তলা) পল্টন চায়না টাউন (পশ্চিম টাওয়ার), ৬৭/১, নয়াপল্টন ভি আই পি রোড, ঢাকা -১০০০, বাংলাদেশে।
ইমেইল : [email protected]