রাজশাহীতে দত্তক নেওয়ার ১৫ বছর পর এক তরুণীকে অস্বীকার করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসক মায়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই তরুণী চরম আত্মপরিচয় সংকটে পড়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) ভুক্তভোগী তরুণী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
ভুক্তভোগী ওই তরুণীর নাম ক্লাউডিয়া চৌধুরী। জন্মের পর থেকেই ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও প্রয়াত ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকে নিজের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন তিনি।
তবে গত বছরের ৭ জুন হঠাৎ করেই ক্লাউডিয়াকে জানানো হয়, তিনি ওই পরিবারের জন্মগত সন্তান নন। এরপরই এক কাপড়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াই নয়, কৌশলে জন্মনিবন্ধনসহ জেএসসি ও এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে বাবা-মায়ের নামও বদলে ফেলা হয়েছে। এমনকি তার নামে হেবা দলিলে লিখে দেওয়া ৫ কাঠা জমিও ফেরত পেতে মামলা করা হয়েছে।
জানা গেছে, সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে এমন অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ করে নিজের শেকড় ও পরিচয় হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্লাউডিয়া।
ভুক্তভোগী ক্লাউডিয়া জানান, জোরপূর্বক তাকে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। পরিচয় বদলে যাওয়ায় কলেজে ভর্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে গিয়ে তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও নষ্ট হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ডা. শিপ্রা চৌধুরী রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে মেয়ের বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদন করেন। ওইদিনই তৎকালীন কাউন্সিলর সেটির অনুমোদন দেন।
এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার এক ইউপি চেয়ারম্যানের সনদপত্র ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে জন্মনিবন্ধন ও একাডেমিক সনদে ক্লাউডিয়ার জৈবিক পিতা-মাতা হিসেবে মো. বাবুল ও মোসা. টগরী বেগমের নাম যুক্ত করা হয়।
তবে মোসা. টগরী বেগম জানিয়েছেন, ক্লাউডিয়া তার গর্ভের সন্তান নন। তার নাম ব্যবহার করে ডা. শিপ্রা চৌধুরী মূলত প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ক্লাউডিয়ার জৈবিক বাবা মো. বাবুল জানান, ২০০৮ সালে শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার সময় তাকে দিয়ে একটি কাগজে সই করানো হয়েছিল, যেখানে তার আর কোনো দাবি থাকবে না বলে শর্ত ছিল। এখন হঠাৎ করে মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও, মেয়ে তাকে চেনে না বলে তিনি চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০০৮ সালে ডা. ওবায়দুর ও ডা. শিপ্রা নিজেদের সন্তান পরিচয়েই জন্মনিবন্ধন করিয়েছিলেন। তবে ২০২৩ সালে তারা দত্তক সন্তান দাবি করে নাম পরিবর্তনের আবেদন করলে তৎকালীন কাউন্সিলর তা অনুমোদন দেন।
সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তার পুত্রবধূ অস্ট্রেলিয়া থেকে ফোনে জানান, ডা. শিপ্রা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলী আশরাফ মাসুম বলেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে কি না তা তদন্ত সাপেক্ষ। তবে বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধান হওয়া জরুরি।