জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে ফ্রান্সজুড়ে আবারও বিক্ষোভ-ধর্মঘট শুরু হয়েছে। নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ায় চাপে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির বিভিন্ন শহরে পতাকা হাতে রাজপথে নামেন হাজারো মানুষ। সরকারি কর্মীদের ধর্মঘটের পাশাপাশি আন্দোলনে সমর্থন জানায় শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।
বামপন্থি শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-সহ কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন এ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। সংগঠনটির প্রধান সোফি বেনে এলসিআই টেলিভিশনকে জানান, ফ্রান্সের ২৬০টি শহর ও নগরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে এই আন্দোলন ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটিতে বড় ধরনের নাগরিক অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে প্যারিসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় ময়লার পাত্র রেখে যান চলাচলে বাধা দেন।
পরে দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই ও লিওঁ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নঁতে শহরেও বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানী প্যারিসে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে মূল সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল।
লিওঁতে বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনকে মুখে মাস্ক ও চোখে সুরক্ষাচশমা পরতে দেখা যায়। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁরা এসব সরঞ্জাম সঙ্গে রাখেন।
নিরাপত্তায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন
গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় ফ্রান্সের নিরাপত্তা বাহিনী অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সেদিন বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট ও সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ম্যাক্রোঁর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা বাড়ে।
নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভে পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ মানুষ অংশ নিতে পারেন।
ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে উৎপাদন কমে গেলেও পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, পাশে শিক্ষক-কর্মীরা
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পরিবেশের অবনতি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। লিওঁর একটি বিক্ষোভের ব্যানারে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইরমা দ্য বানভিল বলেন, তাঁরা যতটা সম্ভব আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে পুলিশের সহিংসতার আশঙ্কায় অনেকে ভয়ে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন না।
ফরাসি সরকার পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভের আগে বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। এতে বিদ্যালয়ের পরিবেশের অবনতি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়।
ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের লক্ষ্য হলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং যতটা সম্ভব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুরু করা।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সংকটের আগের সময়ের তুলনায় চলতি সপ্তাহে অবরুদ্ধ উচ্চবিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভও মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো জীবনযাত্রার মান ও সরকারি নীতির বিষয়ে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছে।
সূত্র: রয়টার্স