ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৯১৭-১৯৪৮) সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে দাখিল করা ৪০০ পৃষ্ঠার একটি আইনি পিটিশনের এক বছর পরও কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। গত বছরের (২০২৫) সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই পিটিশন জমা দেওয়া হয়েছিল। এক বছর পরও এ বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এর উদ্যোক্তারা। গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’ নামের একটি প্রচারণা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ১৪ জন ফিলিস্তিনির হয়ে পিটিশনটি দাখিল করা হয়। এতে ১৯১৭ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের সময়কার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের আইনি পর্যালোচনা দাবি করা হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবী ও একাধিক আইন ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ এই পিটিশন তৈরি করেছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বেন এমারসন কেসি, ড্যানি ফ্রিডম্যান কেসি, ইতিহাসবিদ অ্যাভি শ্লাইম ও আইন বিশেষজ্ঞ ভিক্টর কাটান। পিটিশনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং ব্যাপকভাবে বাড়িঘর ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পিটিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, ওই সময়ে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য ব্রিটেনকে ঐতিহাসিক ও আইনি দায় স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা এবং পরবর্তী ম্যান্ডেট ব্যবস্থার আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’ বলছে, ফিলিস্তিনের বর্তমান সংকটের ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসনামলকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান গাজা ও পশ্চিম তীরের সংকটের সঙ্গে এক শতাব্দী আগের ব্রিটিশ সিদ্ধান্তগুলোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পিটিশনটি এমন একসময়ে সামনে এল, যখন ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্রিটেনের নীতিতেও পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য ও নির্দিষ্ট সেবা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
তবে ঔপনিবেশিক আমলের কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকারের বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। এক শতাব্দী আগের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে বা ক্ষতিপূরণ ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে কী ধরনের আইনি কাঠামো প্রযোজ্য হবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এদিকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে কোনো জবাব না পাওয়ায় পিটিশনের উদ্যোক্তারা ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও দায়বদ্ধতার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পুরোনো এই ইতিহাস আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।