খবরটি হয়তো একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবু লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না আর্জেন্টিনা। রাজধানী বুয়েনস এইরেসের দেয়ালে আঁকা মেসির প্রতিকৃতি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের বার্তা—সবখানেই এখন কেবল কৃতজ্ঞতা, শূন্যতা আর চোখের জল।
গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন চিঠিতে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল থেকে অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি। দীর্ঘদিন ধরে যে মুহূর্তটির আশঙ্কা করছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা, শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো। এর মধ্য দিয়ে আকাশি-সাদা জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণিল পথচলার ইতি ঘটল।
ঘোষণার পর থেকেই আর্জেন্টিনাজুড়ে মেসিকে ঘিরে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। বুয়েনস এইরেসে তাঁর প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে ছবি তুলেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে গেছে মেসির গোল, বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরা এবং জাতীয় সংগীতের সময় সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার পুরোনো সব ভিডিওতে।
বুয়েনস এইরেসের বেলগ্রানো এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী ফ্রান্সিসকা মিয়েথ বলেন, ‘এটি মেনে নেওয়া কঠিন হবে। একটি দেশ হিসেবে তিনি আমাদের যে আনন্দ দিয়েছেন, তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।’ একই এলাকার বাসিন্দা হোসে আরামবুর মতে, সমালোচনা ও ব্যর্থতার পরও হাল না ছেড়ে একটি স্বপ্নের পেছনে ছুটে যাওয়ার যে শিক্ষা মেসি দিয়ে গেছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘লা নাসিওন’ মেসির এই ঘোষণাকে ‘একটি যুগের সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। স্থানীয় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মনোবিদেরা এমনকি সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের কোনো ফুটবলারের ওপর যেন অযথাই ‘পরবর্তী মেসি’ হওয়ার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
মেসির বিদায়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ)। তাদের বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রাটি উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। তোমার উত্তরাধিকার আমাদের হৃদয়ে চিরকাল থেকে যাবে।’
সতীর্থদের বার্তাতেও ফুটে উঠেছে এক বিশাল শূন্যতা। এনজো ফার্নান্দেজ জানিয়েছেন, পরবর্তী জাতীয় দল শিবিরে সামনে ১০ নম্বর জার্সি পরা মেসিকে দেখতে না পাওয়ার কথা তিনি কল্পনাই করতে পারছেন না। রদ্রিগো দি পল মেসিকে ‘চিরন্তন’ উল্লেখ করে লিখেছেন, তিনি আর্জেন্টিনার মানুষের মুখে অসংখ্য হাসি এনে দিয়েছেন। আর আনহেল দি মারিয়ার বার্তা, মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলতে দেখার জন্য তিনি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন।
আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেসির সম্পর্ক অবশ্য সব সময় এতটা মসৃণ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর প্রবল সমালোচনার মুখে ২০১৬ সালে একবার অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে মানুষের ভালোবাসায় ফিরে এসে বদলে দেন পুরো গল্প। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা ও পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জেতেন তিনি। দেশের হয়ে ২০৭ ম্যাচে রেকর্ড ১২৫ গোল করে বিদায় নিলেন এই কিংবদন্তি।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারের ম্যাচটিই হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ উপস্থিতি। বিদায়টা শিরোপা দিয়ে রূপকথার মতো হলো না ঠিকই, তবু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে সেই হার মেসির দুই দশকের জাদুকরি গল্পকে সামান্যতম ম্লান করতে পারেনি। ১০ নম্বর জার্সিতে আগামী দিনে হয়তো নতুন কেউ মাঠে নামবেন, কিন্তু জাতীয় সংগীতের সময় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত সেই মুখটি আর দেখা যাবে না—এই নিরেট বাস্তবতাই এখন কাঁদাচ্ছে গোটা আর্জেন্টিনাকে।