প্রথমে কেঁপে উঠেছিল মাটি, ঠিক সাত মিনিট পর নেমে এল পাহাড়। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির দানবীয় দেয়াল মুহূর্তেই গিলে নিল ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকা মানুষদেরও অনেককে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সেই স্রোত। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যার (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ভয়াবহ চিত্র এটি। এ বন্যায় এরই মধ্যে ১৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে বন্যার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সাত মিনিট আগে ঘটে যাওয়া একটি ভূমিকম্প।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, চীনের তিব্বত অংশে থাকা নিরাপত্তাক্যামেরায় বিপর্যয়ের দৃশ্য ধরা পড়ার আনুমানিক সাত মিনিট আগে অঞ্চলটিতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। সময়ের এই মিল থেকে নেপালি কর্মকর্তাদের ধারণা, কম্পনের কারণেই হিমবাহ ও আশপাশের পাহাড়ি ভূখণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে ধসের সৃষ্টি হতে পারে। তবে ভূমিকম্পই যে হিমবাহ ধসের একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা একটি হিমবাহের সামনের বড় অংশ ভেঙে যায়। বরফের বিশাল সেই অংশটি প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার সময় পাথর ও মাটি টেনে নিয়ে ভয়ংকর ধসের সৃষ্টি করে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রসুয়াগঢ়ি সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে খোলা নদীর কাছে ধসটির উৎপত্তি।
হিমবাহ ভেঙে পড়ার পেছনে সাম্প্রতিক উষ্ণ আবহাওয়াও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তুষার গলে গিয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট এই ধসের জন্য এখনই সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করতে রাজি নন বিজ্ঞানীরা।
ধসের পর বরফ, কাদা ও পাথরের স্রোত এত দ্রুত নিচে নেমে আসে যে গালছি এলাকায় মাত্র আধা ঘণ্টায় নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। নিরাপত্তাক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল স্রোত ভবন ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। লেন্দে খোলা নদীর উজানে একটি বড় বাধা রয়ে গেছে। সেটি হঠাৎ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আরও একটি ঢল নামতে পারে। তাই নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নেপালের নদীগুলো দিয়ে ঢল ভারতের সমতলে পৌঁছানোর আশঙ্কায় বিহার ও উত্তর প্রদেশেও ইতিমধ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।