শিশু-কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আসক্ত করতে পরিকল্পিতভাবে প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলার ঐতিহাসিক বিচার শুরু হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্ল্যাটফর্ম শিশুদের আসক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি।
মামলায় ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি—এই চার অঙ্গরাজ্য অভিযোগ করেছে, মেটা তাদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে তরুণ ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকেন। এর ফলে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। এ ছাড়া ২৯টি অঙ্গরাজ্যই অভিযোগ করেছে, মেটা শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে।
মামলার শুনানিতে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও’নিল বলেন, ‘মেটার ব্যবসায়িক মডেলই ছিল ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা, যত বেশি সম্ভব সময় তাঁদের যুক্ত রাখা, তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকৃত তথ্য গোপন করা।’ তাঁর দাবি, মেটা শিশুদের প্রয়োজন মনে করত এবং নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করত।
মেটার আইনজীবী পল শ্মিট এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে কিশোরদের মানসিক সুস্থতার অবনতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও প্রতিষ্ঠানটির সেবা আরও উন্নত করতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যবহারকারীরা যদি সেবা পছন্দ না করেন, তাহলে মেটার ব্যবসা ভালো করবে না—এটাই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান।’
এ মামলায় জুরিরা একটি পরামর্শমূলক রায় দেবেন। তবে মেটা দায়ী কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন মার্কিন জেলা জজ ইভন গনজালেজ রজার্স। মেটাকে দায়ী করা হলে আদালত প্রতিষ্ঠানটির ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপের পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কাঠামোগত পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবীরা মনে করছেন, জরিমানার পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন (২০ হাজার কোটি) ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। তবে মেটার দাবি, এই জরিমানা সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এ ছাড়া অঙ্গরাজ্যগুলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘লাইক’ ব্যবস্থা ও ‘স্ক্রলিং’ বন্ধ, কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ এবং ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে রাখার মতো পরিবর্তন চেয়েছে।
মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে মেটার সাবেক নিরাপত্তা প্রকৌশলী আর্তুরো বেহার সাক্ষ্য দিয়েছেন। আদালতে তিনি বলেন, মেটার অভ্যন্তরে দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনার ওপর জোর দেওয়া হতো এবং পণ্য তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপত্তাকে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও মেটা যথেষ্ট কঠোর ছিল না।
প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলতে যাওয়া এই বিচারপ্রক্রিয়ায় মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিরও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার বিচার শুরুর পর মেটার শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৫৪৩ ডলার ৬৭ সেন্টে নেমে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে মেটাসহ স্ন্যাপ, টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স এবং ইউটিউবের মালিক অ্যালফাবেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে মেটার সাবেক কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার ফ্রান্সেস হাউগেন মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে অভিযোগ করেছিলেন, মেটা শিশুদের জন্য তাদের পণ্যগুলোর ঝুঁকি সম্পর্কে জানত, কিন্তু বেশি মুনাফার আশায় তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
এ বছরের মার্চে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি আদালত মেটা ও গুগলকে এক তরুণীকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। চলতি মাসের শুরুতে নিউ মেক্সিকোর এক বিচারকও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি মোকাবিলায় মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন।