আসন্ন ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দল গোছানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে রাজপথে সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ঢেলে সাজানো হচ্ছে দলটিকে।
একই সঙ্গে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এবং কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই তোড়জোড়। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তারেক রহমানের বৈঠক ও দিকনির্দেশনা
দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহের শনিবার রাতে ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, তৃণমূল পর্যায়কে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়ানোর কঠোর নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সহযোগিতার বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সমানতালে চলমান রয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল গোছানো হবে। তবে জাতীয় কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নির্ধারণ হয়নি।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘বিএনপি একটি সুবিশাল রাজনৈতিক দল। তৃণমূলের কর্মীরাই আমাদের প্রাণ। দল গোছানোর কাজ চলমান প্রক্রিয়া। বিএনপিসহ অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সাংগঠনিক গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে।’
যে কোনো সময় বড় রদবদল
বিএনপির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো ফ্রন্ট অর্গানাইজেশনগুলোর শীর্ষ পদে বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে এসব সংগঠনের ‘সুপার ফাইভ’ বা আংশিক কমিটি। এ ছাড়াও নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, মহিলা দল এবং মৎস্যজীবী দলও—যা আগামী কাউন্সিলের আগে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।
পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে:
ছাত্রদল: নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্রদের নেতৃত্বে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজপথের ত্যাগী ও তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল: বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যাঁরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক মামলা রয়েছে, তাঁদের শীর্ষ পদে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মহিলা দল ও শ্রমিক দল: নারী নেতৃত্ব বিকাশ এবং তৃণমূলের শ্রমিকদের সংগঠিত করতে এই দুই সহযোগী সংগঠনকেও নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
নিষ্ক্রিয়দের বিদায়, ত্যাগীদের মূল্যায়ন
বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে বেশির ভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ অনেক নেতা সরকারের এমপি-মন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন কর্মীরা।
এই স্থবিরতা ভাঙতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কড়া বার্তা দিয়েছেন। যাঁরা বিগত দিনে রাজপথে নিষ্ক্রিয় ছিলেন বা সুযোগসন্ধানী ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ইউনিটে একই নেতৃত্ব থাকায় দলে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে এই পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তরুণদের সামনে আনা এবং রাজপথের ত্যাগী ও মামলা-হামলার শিকার নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের সিদ্ধান্তটি দলে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে।

ডেস্ক রিপোর্ট