আইন আর বিচারের বাণী কি কেবলই স্থান-কাল-পাত্রভেদে রূপ বদলায়? এই প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মাগুরার এক অসহায় পরিবারের মনে। রামিশা হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া আইনি জটিলতা পেরিয়ে রায়ের আলো দেখলেও, মাগুরার নির্মম নির্যাতনের শিকার শিশু আছিয়া খাতুনের পরিবার এখনো অন্ধকারের অতলে হাবুডুবু খাচ্ছে। বছর পেরিয়ে গেলেও আছিয়া নির্যাতনের মামলার রায় তো দূরের কথা, বিচার আদৌ শেষ হবে কিনা—তা নিয়েই দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
দুটি ভিন্ন অপরাধ, ভিন্ন সীমান্ত। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের কান্নার সুর এক। অথচ দুই মামলার বিচার প্রক্রিয়ার গতি চিত্র দেশের বিচার ব্যবস্থার এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
রামিশা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি: একটি দৃষ্টান্ত
বহুল আলোচিত প্রতিবেশীর পাশবিক লালসার শিকারে শিশু রামিসা খাতুন হত্যা মামলাটির রায় সম্প্রতি ঘোষিত হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছে সেখানকার আদালত। আইনি প্রক্রিয়ার কোনো দীর্ঘসূত্রতা বা প্রভাবশালী মহলের চাপ এই মামলার গতি রোধ করতে পারেনি। রামিসার পরিবার বিলম্বে হলেও ন্যায়বিচার পেয়েছে, যা সমাজ ও অপরাধীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
আলোর মুখ দেখেনি মাগুরার আছিয়া মামলা
ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মাগুরার আছিয়া খাতুনের মামলায়। নৃশংস শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আছিয়া যখন বিচার চেয়েছিল, তখন দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও, সময়ের সাথে সাথে তা যেন কেবলই কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে মামলার অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা: অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিতেই পার হয়ে গেছে দীর্ঘ সময়। সাক্ষী না আসা: আদালতের নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি মামলার গতিকে সম্পূর্ণ থমকে দিয়েছে। প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য: স্থানীয় সূত্রে খবর, আসামিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি ও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
'আদৌ কি বিচার হবে?'
আছিয়ার কান্নাকাতর মায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, "আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। শুনলাম ওদিকের রামিশার বিচার হয়ে গেছে। কিন্তু আমার মেয়ের জীবনটা যারা শেষ করে দিল, তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আদালত আর কতদিন আমাদের ঘোরাবে? আদৌ কি আমরা বিচার পাব, নাকি এইভাবেই আমাদের দিন পার হবে?"
মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার পাহাড় জমে থাকায় এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এছাড়া পুলিশি তদন্তে গাফিলতি এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার অভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখে। আছিয়ার মামলার ক্ষেত্রেও ঠিক এই আইনি ফাঁক ফোকর ও সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।
রামিসার মামলার রায় প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র ও আইন প্রশাসন চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব। মাগুরার আছিয়ার পরিবার আজ যে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তা দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। আছিয়ার রায় কি আদৌ হবে? নাকি এটিও ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া আর দশটি সাধারণ মামলার মতো হারিয়ে যাবে—সেই উত্তর পেতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা কেউ জানে না। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে অবিলম্বে এই মামলার বিশেষ ট্রায়াল এবং দ্রুত রায় ঘোষণা করা সময়ের দাবি।
আবুল হোসাইন
পিএইচডি, গবেষক ও কলামিস্ট
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক
রামিসার রায় হলেও অন্ধকারের অতলে মাগুরার আছিয়ার পরিবার: কবে মিলবে বিচার?
- আপলোড সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ১১:৩৫:৪৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ১১:৫৬:৪৯ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

ডেস্ক রিপোর্ট