একসময় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC) বা সার্ককে দেখা হতো। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার সদস্য ছিল আটটি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তান। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
তবে বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সার্ক তার সম্ভাবনা অনুযায়ী কার্যকর হতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরীয় বহুমুখী কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (BIMSTEC) বা বিমসটেককে একটি বিকল্প আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—দক্ষিণ এশিয়ায় কি বিমসটেক সত্যিই সার্কের স্থান নিতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমসটেক তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় এবং সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করেছে, তবুও সার্ককে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভবত বাস্তবসম্মত নয়। বরং বিমসটেককে একটি পরিপূরক আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত, যা অঞ্চলের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
বিমসটেকের গুরুত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো সার্কের কার্যকারিতার সংকট। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন, কিন্তু তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের আবাসস্থল হওয়া সত্ত্বেও সার্ক আঞ্চলিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমসটেক ভিন্ন ধরনের কাঠামো নিয়ে কাজ করে। এর সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং ভুটান। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে এই সংগঠন দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন করেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, পাকিস্তান এর সদস্য নয়, যা সার্কের ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক জটিলতার উৎস ছিল। এর ফলে সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো, জ্বালানি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বাস্তবমুখী খাতে সহযোগিতার ওপর অধিক মনোযোগ দিতে পেরেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিমসটেকের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এর সাতটি সদস্য দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি এবং সম্মিলিত অর্থনীতির আকার ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সড়ক, বন্দর, রেলপথ এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কের উন্নয়ন আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও বিমসটেক একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকার কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। উন্নত আঞ্চলিক সংযোগ বাংলাদেশের জন্য ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং পরিবহনভিত্তিক প্রকল্পগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিমসটেক বর্তমান ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ব রাজনীতিতে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য সহযোগিতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে। বিশেষত ভারত তার “Neighborhood First” এবং “Act East” নীতির অংশ হিসেবে বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন সংগঠনটির কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
তবে বিমসটেকেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা সার্ককে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। প্রথমত, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ এখনও আসিয়ান (ASEAN) বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মতো অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠনের তুলনায় অনেক কম। বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং নীতিগত বৈষম্য এখনো গভীরতর অর্থনৈতিক সংহতকরণের পথে বাধা হয়ে আছে।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বিমসটেক এখনও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যদিও এটি একটি সনদ (Charter) গ্রহণ করেছে এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে। অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে না। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এর সদস্য নয়। ফলে এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে পারে না। অভিবাসন, জনস্বাস্থ্য, সীমান্তবর্তী নদীর পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর সহযোগিতার জন্য এখনো একটি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হতে পারে, যা সার্ক প্রদান করতে সক্ষম।
এছাড়া সার্ককে পুরোপুরি বাদ দেওয়া আঞ্চলিক বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সাধারণত আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করে; তাদের বাদ দিয়ে নয়। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সার্কই একমাত্র সংগঠন, যা দক্ষিণ এশিয়ার সব রাষ্ট্রকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। তাই এর পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
পরিশেষে বলা যায়, বিমসটেকের উত্থান মূলত সার্কের সীমাবদ্ধতার প্রতি একটি বাস্তব প্রতিক্রিয়া। এটি যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে। তবে সদস্যপদ ও কার্যপরিধির মৌলিক পার্থক্যের কারণে এটি সার্ককে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তাই এই দুই সংগঠনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে নীতিনির্ধারকদের উচিত তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ও উদ্দেশ্যকে স্বীকৃতি দেওয়া।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ সম্ভবত সার্ক ও বিমসটেকের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার ওপর নির্ভর করবে না; বরং এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর নির্ভর করবে, যেগুলো জনগণের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনতে সক্ষম। বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিমসটেক তুলনামূলকভাবে বেশি সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছে। তবে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং সমন্বিত দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে হলে শেষ পর্যন্ত এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর প্রয়োজন হবে, যা অঞ্চলের সব দেশকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম।
সাদিকা আফরোজ
৪র্থ বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
