শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অপ্রতিমকে নিয়ে ফেসবুকে অপপ্রচার ও ফোনে হয়রানি, ব্যবস্থা নিলেন বাবা জাতিসংঘে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক প্রতিবেশী দেশে ইসলামবিদ্বেষ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ চাইলেন শাহবাজ শরিফ হরমুজ প্রণালি বন্ধ: সড়কপথে জ্বালানি পরিবহনের নতুন করিডোর চালু মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর চুক্তিতে রূপ নিতে পারে মক্কা প্যাক্ট, যোগ দিতে পারে ইরানও দুই বছরের শিশুকে মাটিতে ছুড়ে ফেললেন দাদি, থানায় মায়ের অভিযোগ ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক কারও চাকরি হবে না: ছাত্রদল নেতা হামিম শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া চরম বৈষম্যমূলক: ভিপি সাদিক কায়েম জাতিসংঘে এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ বলায় নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ তুরস্ক আসিয়ান কাপে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে বাংলাদেশের শুরু ‘পাকিস্তান সফর কবে’, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী কোরআনের দৃষ্টিতে সুখের সংজ্ঞা কী? জরুরি সামরিক বৈঠকে বসছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ফের চালু হলো ভোটার এলাকা স্থানান্তর, যেভাবে আবেদন করবেন অক্টোবরে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ, কারা পাবেন? আলোচিত সেই বিউটি পাল এবার সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী বেতন ছাড়াও আকর্ষণীয় সুবিধায় ওয়ালটনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আগামী শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা থাকবে, কারণ কী বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

ড্রাগনের ছায়ায় দক্ষিণ এশিয়া: চীনের প্রভাব, সুযোগ ও কৌশলগত ভারসাম্যের রাজনীতি

  • আপলোড সময় : ২২-০৬-২০২৬ ০৫:৫৩:২৪ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২২-০৬-২০২৬ ০৫:৫৪:২৬ অপরাহ্ন
ড্রাগনের ছায়ায় দক্ষিণ এশিয়া: চীনের প্রভাব, সুযোগ ও কৌশলগত ভারসাম্যের রাজনীতি
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উত্থান একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঘটনা। বিপুল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সহযোগিতা, উন্নয়ন ঋণ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বেইজিং এ অঞ্চলে তার প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। শ্রীলঙ্কার বন্দর থেকে পাকিস্তানের মহাসড়ক এবং বাংলাদেশের জ্বালানি প্রকল্প পর্যন্ত সর্বত্রই চীনের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের উপায় হিসেবে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে একই সঙ্গে অন্যরা আশঙ্কা করছে যে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য প্রশ্নটি আর এই নয় যে তারা চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে কি না; বরং কীভাবে তারা চীনের উত্থানের সুযোগ ও ঝুঁকিকে পরিচালনা করবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করার ক্ষেত্রে চীনের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), যা ২০১৩ সালে একটি বৈশ্বিক অবকাঠামো ও সংযোগ কৌশল হিসেবে চালু করা হয়। BRI-এর মাধ্যমে চীন পুরো অঞ্চলে সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পাঞ্চল নির্মাণ করেছে। এর অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হলো পাকিস্তানের বহু বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)। একইভাবে, চীনা বিনিয়োগ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং মালদ্বীপের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের উন্নয়নেও সহায়তা করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য এসব বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ করেছে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মূলধনের যোগান দিয়েছে। দ্রুততর পরিবহন ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ এবং শিল্প সুবিধা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে পারে। এক অর্থে, এটি চীনা সম্পৃক্ততার এমন একটি ধরন, যা ঐতিহ্যগত উন্নয়ন সহযোগীরা একই মাত্রায় দিতে সক্ষম হয়নি বা দিতে আগ্রহী ছিল না।

তবে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, কিছু চীনা ঋণ ঋণনির্ভরতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সীমিত। শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকট এবং হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার ঘটনা চীনা অর্থায়নের কৌশলগত পরিণতি নিয়ে আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। যদিও এ ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও রাজনৈতিক চাপের বিষয়টিকে সামনে এনেছে।

অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি কৌশলগত বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বহিরাগত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চীন তার উপস্থিতি বিস্তার করার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ভারত, বেইজিংয়ের বহু উদ্যোগকে তার কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই প্রতিযোগিতা ছোট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। তারা বিভিন্ন অংশীদারিত্ব থেকে সুবিধা নিতে চাইলেও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চায় না।

চীন ও ভারতের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা কূটনৈতিক নমনীয়তা হ্রাস করতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। এ কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি সরকার ‘হেজিং’ নীতি অনুসরণ করছে অর্থাৎ, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ভারত, পশ্চিমা দেশসমূহ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করছে।

চীনের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করা উচিত। প্রথমত, বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। জনপর্যবেক্ষণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে যে অবকাঠামো প্রকল্পগুলো কেবল সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের উৎস বৈচিত্র্যময় হলে কোনো একটি বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিরোধ নিষ্পত্তিকে উৎসাহিত করে। আরও কার্যকর আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান ছোট রাষ্ট্রগুলোকে বৃহৎ শক্তির সঙ্গে আলোচনায় অধিক দরকষাকষির ক্ষমতা দিতে পারে।

এছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলোর উচিত স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের পরিবর্তে টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অবকাঠামো প্রকল্প মূল্যায়নের সময় অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং জাতীয় স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগের সুবিধা সর্বোচ্চ করা এবং ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।

চীনের উত্থানের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হচ্ছে। এটি যেমন অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিপুল সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি কৌশলগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসছে। অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কেবল চীনের প্রভাবকে প্রতিরোধ করার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না; বরং সেই প্রভাবকে কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুফল কাজে লাগাতে পারবে, একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও রক্ষা করতে সক্ষম হবে। ড্রাগনের ছায়ায় টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি আত্মসমর্পণ নয়; বরং ভারসাম্য অথবা প্রয়োজনে মোকাবিলা।

লেখক- নাজিফা আনজুম তারা, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অপ্রতিমকে নিয়ে ফেসবুকে অপপ্রচার ও ফোনে হয়রানি, ব্যবস্থা নিলেন বাবা

অপ্রতিমকে নিয়ে ফেসবুকে অপপ্রচার ও ফোনে হয়রানি, ব্যবস্থা নিলেন বাবা