সরকারি কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন নিয়মে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের ফৌজদারি মামলায় জড়িত ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশ নেওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। উন্মুক্ত দরপত্রে নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে কাজের মান ও স্থায়িত্বের জন্য বরাদ্দ থাকবে মোট নম্বরের ৮০ শতাংশ।
‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় এসব প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ৯ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে আইনটি পাস হতে পারে। এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। সরকারি কাজের দরপত্র সংশোধনে গঠিত কমিটির একাধিক সদস্য এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, এত দিন এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের ক্ষেত্রে লটারি করা হতো। এসব কাজে ৫ শতাংশ পর্যন্ত লেস অর অ্যাবাভ (দর কম বা বেশি) দেওয়ার নিয়ম ছিল।
নতুন প্রস্তাবে লটারির সীমা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা হচ্ছে। আয়কর, ভ্যাট, ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক সলভেন্সির কাগজপত্র থাকলেই ঠিকাদাররা আবেদন করতে পারবেন।
১০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের কাজে ওটিএম (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে। এত দিন এ পদ্ধতিতে কাজ দেওয়ার আগে আগের পাঁচ বছরের সব কাজের ওয়ার্ক অর্ডার বিশ্লেষণ করে নম্বর দেওয়া হতো। সেই নম্বরের ভিত্তিতে ঠিকাদার নির্বাচন করা হতো। নতুন প্রস্তাবে ২৫ বছর পর্যন্ত কাজের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন কোনো কোম্পানি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে দরপত্রে আবেদন করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি লেস অর অ্যাবাভ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সরকারি ক্রয় কার্যক্রমকে অধিকতর ফলপ্রসূ ও অর্থবহ করার সুপারিশ দিতে গঠিত কমিটির সদস্য। দরপত্রের নিয়ম পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, “আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর লক্ষ্য করলাম, বিগত সময়ে যারা বড় বড় কাজ করেছেন, কিন্তু সঠিকভাবে সম্পাদন করেননি। কিন্তু বিদ্যমান শর্তের কারণে ঘুরেফিরে তারাই দরপত্রে অংশ নিচ্ছেন। নতুন ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের আগ্রহ থাকলেও তারা অংশ নিতে পারেন না। তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিয়ম পরিবর্তনে একটা কমিটি গঠন করা হয়। তার আলোকে সরকারি ক্রয় বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
প্রস্তাবিত নতুন পদ্ধতিতে দেশের ভেতরে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে কাজের মান ও স্থায়িত্বের জন্য মোট নম্বরের ৮০ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে। আর্থিক সক্ষমতার জন্য রাখা হবে ২০ শতাংশ।
দুই অংশের নম্বর মিলিয়ে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হবে। ফলে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানই যে কাজ পাবে, এমন নিশ্চয়তা থাকবে না।
সরকারি কেনাকাটায় দেশে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির দেশীয় পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে চাইলে বাংলাদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করতে হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি কাজের দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঠিকাদার নৈতিক স্খলন, রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড বা বড় ধরনের ফৌজদারি মামলায় জড়িত থাকলে তাঁকে অযোগ্য বিবেচনা করা হতে পারে।
দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সিটি এলাকার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার প্রত্যয়ন নেওয়ার বিধানও রাখা হতে পারে।
বর্তমানে সরকারি দরপত্রে ২০২২ সালের রেট শিডিউল প্রচলিত রয়েছে। গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজ করতে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন ঠিকাদাররা।
এ সমস্যা সমাধানে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন রেট শিডিউল তৈরির চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন রেট শিডিউল সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং ইতোমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ায় থাকা কাজের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।
