দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। ছোট ভাইকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। বোনের বিয়ে দেবেন আর বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে একটি ছোট্ট বাড়ি নির্মাণ করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আর পূরণ হয়নি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা তরুণ জসিমের। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নয়ারনগর গ্রামের সন্তান ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর সঙ্গে যেন নিভে গেছে একটি অসহায় পরিবারের শেষ আশার প্রদীপ।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থিত হয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি জসিমের মা আছিয়া বেগম (৫২)। পাশে ছিলেন অসুস্থ বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৭)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা তুলে ধরেন এক বুক কষ্ট, অপূর্ণ স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রামের গল্প।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা জসিমকে দশম শ্রেণির পরই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় গিয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন তিনি। প্রতি মাসে উপার্জনের প্রায় পুরো টাকাই পাঠিয়ে দিতেন বাড়িতে। সেই অর্থেই কোনো রকমে দুবেলা খাবার জুটত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ও বউ-সন্তান্দের। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন জসিম।
ছেলের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, “আম্মা, আমি বিদেশ যামু গা। আমাদের তো জাগা-জমি নাই, থাকি নানার বাড়িত। কতকাল থাকমু? বিদেশ যাইয়া কামাই কইরা তোমারে ঘরে রাইখা যেন মরবার পারি।” এই কথাগুলো প্রায়ই মাকে বলতেন জসিম। নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যই ছিল তার সব স্বপ্ন। বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করবেন। একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। ছোট ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করবেন। বোনের বিয়ে দেবেন এবং সারাজীবন কষ্ট করে যাওয়া বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আজ শুধুই স্মৃতি।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার নর্দা ওভারব্রিজের পাশে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন জসিম। দীর্ঘ কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ১৪ আগস্ট সকাল ১১টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
জসিমের মৃত্যুর পর যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। তাদের নিজের কোনো বসতভিটা নেই। এখনও আত্মীয়ের বাড়িতেই আশ্রয় নিয়ে দিন কাটছে। অসুস্থ বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম শারীরিকভাবে আর কাজ করতে পারেন না; হাত প্রায় অবশ হয়ে আসে। সংসার চালাতে গিয়ে পরিবারকে নিতে হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ। অন্যদিকে বিবাহযোগ্য বোনের বিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার সামনে ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন আছিয়া বেগম। তিনি উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অতিথি এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক লিটন আকন্দ, সদস্যসচিব মামুনুর রশীদসহ সবার কাছে হাত বাড়িয়ে পরিবারের জন্য সাহায্যের আবেদন জানান। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দুইয়ের ভার যেন একসঙ্গে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
পরিবারের দাবি, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা জসিমের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করলেও তার পরিবারের পাশে এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি। আজও তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে আর বোনের বিয়ের স্বপ্নও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই শহীদের মায়ের কান্নায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একজন তরুণ নিজের জীবন দিয়ে যে দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই দেশের মাটিতেই আজ তার পরিবার বেঁচে থাকার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে।
জসিম আর ফিরবেন না। কিন্তু তার সেই কথাগুলো “আম্মা, আমি বিদেশ যামু গা…” আজও মায়ের কানে বাজে। যে ছেলে মায়ের মাথার ওপর একটি ছাদ তুলে দিতে চেয়েছিল। সেই মায়ের আজও নিজের বলে কোনো ঘর নেই। দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা একজন সন্তানের পরিবারের এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি জাতির বিবেকের কাছেও এক নীরব প্রশ্ন।
