জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমনে রাজপথে তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচার গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে ৭ দশমিক ৬২ ক্যালিবারের বুলেট, যা মূলত সামরিক রাইফেলে ব্যবহৃত হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে থাকা ১৩০টি মরদেহের মধ্যে ৬৬ শতাংশেরই মৃত্যু হয়েছে সামরিক অস্ত্রের গুলিতে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেলে থাকা ওই ১৩০টি মরদেহের মধ্যে ৬৬ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে সামরিক অস্ত্রের আঘাতে। এ ছাড়া ১২ শতাংশ শর্টগান এবং ২ শতাংশ পিস্তলের গুলিতে মারা গেছেন। বাকি ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে মারধরসহ অন্যান্য কারণে।
জানা যায়, ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পর পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকায়নের নামে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র যুক্ত করার তোড়জোড় শুরু হয়। কেনা হয় চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল ও টরাস ৯ এমএম। ২০১৫ সালে ইতালি থেকে এসব অস্ত্রের প্রথম চালান আসে। এমনকি জুলাই আন্দোলনের মাত্র ৩ মাস আগেও ৫০টি মারণাস্ত্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল পুলিশ।
জুলাই আন্দোলনে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মারণাস্ত্র বলতে যদি কোনো কিছু বোঝানো যায়, ইট ইজ দ্যাট (এটিই তা)। আমি দেখেছি, ৭ দশমিক ৬২ রাইফেলের একটি বুলেট লেগে একটি ছেলের পুরো হাত ভেঙে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের কাছে ৭ দশমিক ৬২ রাইফেল কারা দিয়েছে, এটা প্রথম আমি তদন্ত করব। হাউ ইট কেম? (এটি কীভাবে এল?) সিভিলিয়ানদের হাতেও আমি এই রাইফেল দেখেছি। দে ওয়্যার পার্ট অব পুলিশ (তারা পুলিশের অংশ ছিল)।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক বলেন, ‘সামরিক অস্ত্র অন্য কারও কাছে থাকার কথা নয়; শুধু সামরিক সদস্যদের কাছেই থাকবে। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে। কোনোভাবেই এই প্রাণঘাতী অস্ত্র তারা ব্যবহার করতে পারে না, পারে না, পারে না। সাংবিধানিকভাবে এটি নিষিদ্ধ।’
তবে আরেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী ভিন্ন মত তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কারখানায় যে গোলাবারুদ তৈরি হয়, তার একটি অংশ বাংলাদেশ পুলিশের কাছেও যায়। যেহেতু তারা ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গোলাবারুদ নেন, তাই বলতে হবে, তাদের কাছে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার অস্ত্র আছে।’
জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে যারা মূল পরিকল্পনাকারী, যারা এটার পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করেছে—তাদেরই মূল দায়। আর কনস্টেবল পর্যায়ের যারা মাঠে গিয়ে গুলি করেছে, তাদের অনেক ক্ষেত্রে উপায় ছিল না। সে ক্ষেত্রে আদালতও একেবারে নিম্নপদস্থ বা সাধারণ সৈনিক কিংবা পুলিশ সদস্যদের কম শাস্তি দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যারা প্রধান অপরাধী, স্বাভাবিকভাবেই তারা পালিয়ে গেছে। তারা তো জানে, আদালতে বিচার হলে তাদের কী সাজা হবে। তার অপরাধের গুরুতরতা বিবেচনায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’

ডেস্ক রিপোর্ট